2022-জমির মিউটেশন মানে আসলে কি | Land Mutation in West Bengal | Land Mutation Meaning in Bengali

বিগত কয়েক বছরে জমির মিউটেশন করা নিয়ে রাজ্য সরকার তথা নবান্ন দ্বারা বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নতুন জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হলেও নতুনভাবে নামজারি করা বা খতিয়ান তৈরি করতে গেলে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

আর এই সমস্যা দূর করতে রাজ্যের মুখ্য সচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে কোন ব্যক্তিকে যদি মিউটেশনের জন্য ভুমি ও সংস্কার দপ্তরে বারবার ঘুরতে হয় তাহলে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তিনি আরো জানিয়েছেন যে কোন ব্যক্তির যদি জমি সংক্রান্ত বিষয়ে একাধিক সমস্যাও থাকে, তবুও যেন তাকে হয়রানির শিকার হতে না হয়।

জমির মিউটেশন করা নিয়ে অনেকের মনে নানা রকমের প্রশ্ন সব সময় উঠে থাক। জমি সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের সাধারণ জ্ঞান না থাকার জন্য অনেকে আমাদের থেকে প্রচুর টাকা আদায় করে। আজকের এই প্রতিবেদনটি জমির মিউটেশনকে নিয়েই।

আজকে আমি আপনাদের জমির মিউটেশন সম্পর্কে খুবই সহজ ভাবে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করতে চলেছে আশাকরি তথ্যগুলো জেনে আপনাদের ভালো লাগবে।

Mutation of Land meaning in Bengali

আপনি যখন নতুন কোন জমি কেনেন অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেয়ে থাকেন সে ক্ষেত্রে আধিকারিক দপ্তরে আপনার নামটি শুধুমাত্র রেজিস্ট্রি হয়। তার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি সম্পূর্ণভাবে জমির মালিকানা পেয়ে গেলেন।

যখন ভূমি অফিসে আপনার নামটি রেজিস্টার্ড হয়ে যাবে তারপরে আপনাকে আবার নতুন করে মিউটেশনের জন্য আবেদন করতে হবে।

জমি রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পরেই যখন জমির দলিল টি তুলে ভূমি অফিসে কাজ করার জন্য জমা দেবেন অথবা নামজারি করতে দেবেন তখন সেটা হয়ে যাবেন মিউটেশন।

অর্থাৎ জমি ক্রয়ের পূর্বে ওই জমির খতিয়ান নম্বর এবং দাগ নম্বর যে ব্যক্তির কাছ থেকে আপনি জমিটি নিয়েছিলেন তাঁর নামে থাকবে।

আবার হতে পারে রেকর্ডটি সেই ব্যক্তির নামে নেই,  যার কাছ থেকে জমিটি ওই ব্যক্তিটি কিনেছিল তার নামে রয়েছে, সেক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, মোটকথা জমি রেজিস্ট্রি করবার পর আপনার নামে নতুন করে খতিয়ান নম্বর এর জন্য আবেদন করতে হব। আর একেই বলে মিউটেশন বা নামজারি করা।

এককথায় আপনি যখন জমি কিনবেন সে ক্ষেত্রে সরকারি খাতায় আপনার সেই জমিটির রেকর্ড থাকতে হবে।

এই নামজারি করতে গিয়ে অনেকেই অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয় যেমন ধরুন জমিটি আপনি যার কাছ থেকে কিনেছেন খতিয়ান নম্বর টি তার নামে না থেকে সেই ব্যক্তি যার কাছ থেকে কিনেছিল তার নামে রয়েছে আবার ধরুন আপনি যে ব্যক্তির কাছ থেকে জমিটি কিনছেন খতিয়ান নম্বর টি তার ছেলে মেয়েদের নামে রয়েছে তবে সমস্যা যেটাই হোক না কেন আপনি জমিটি যখন কিনবেন সে ক্ষেত্রে খতিয়ান নম্বর আপনার নামেই করা সম্ভব।

অনেক সময় জটিলতা যদি বেশি হয়ে থাকে তাহলে হয়তোবা আপনাকে খরচটা একটু বেশি করতে হতে পারে। তবুও একটাই কথা মাথায় রাখবেন যে কোনো ধরনের জমিরই রেকর্ড করা সম্ভব।

জমির মিউটেশন কিভাবে করবেন (How to do mutation of a plot)

আগেকার দিনে জমিসংক্রান্ত বিষয়ে কাজকর্ম হত অফলাইনে অর্থাৎ নিজহস্তে ফ্রম পূর্ণ করতে হত এবং ভূমি অফিসে জমা দিয়ে কাজগুলি করতে হতো। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এই বিষয়ে এখন আর বেশি ছোটাছুটি করতে হয় না।

আপনি চাইলে বাড়িতে বসেই আপনার জমির নতুন খতিয়ানের জন্য বা মিউটেশন এর জন্য আবেদন করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট তারিখ এর হেয়ারিং ডেট নিতে পারেন।

এই কাজটি করবার জন্য আপনাকে বাংলার ভূমি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এ গিয়ে করতে হবে।

এই ওয়েবসাইট থেকে আপনি বিভিন্ন ধরনের কাজকর্ম করতে পারবে। যেমন জমির দলিল নম্বর থেকে জমির মালিকের নাম বের করা অথবা খতিয়ান নম্বর থেকে জমির মালিকের নাম বের করা।

যদি আপনার জমির দলিলটি হারিয়ে যায় তাহলে নকল দলিল বের করা, জমির মৌজা ম্যাপ ডাউনলোড করা, আপনার রেকর্ড এর কাগজটি যদি হারিয়ে যায় তাহলে সেটা পুনরায় ডাউনলোড করা ইত্যাদি সমস্ত কাজ এই ওয়েবসাইটের দ্বারা হয়ে থাকে এবং কাজগুলো খুবই সহজ।

আজকে আমরা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যে বাংলার ভূমি ওয়েবসাইট থেকে কিভাবে নতুন খতিয়ানের জন্য আবেদন করা যায় এবং হেয়ারিং এর ডেট নেওয়া যায়।

ধরুন আপনি একটি জমি কিনেছেন কোন এক ব্যক্তি থেকে এবং সেই ব্যক্তির নামে বর্তমান খতিয়ান রয়েছে, যেহেতু আপনি সেই ব্যক্তির থেকে জমিটি কিনেছেন তাই স্বভাবতই আপনার নামে নতুন একটি রেজিস্ট্রি হবে এবং আপনি চাইছেন সেই জমিটির খতিয়ান নম্বর টি আপনার নামে হোক। সে ক্ষেত্রে কি করবেন।

আমি আপনাকে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টি জানাতে চলেছি যে কীভাবে খতিয়ান এর জন্য বাংলারভূমি ওয়েবসাইটে আবেদন করা যায়।

অনলাইনে নতুন খতিয়ান এর জন্য আবেদন করার আগে যে যে বিষয়গুলি আপনাকে লক্ষ্য রাখতে হবে সেগুলো নিম্নরূপ –

জমির মিউটেশন করার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (Documents for Mutation)

  1. আপনাররেজিস্ট্রিকৃতদলিলটির একটি স্ক্যান কপি বানাতে হব। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখবেন এটি পিডিএফ ফরম্যাটে হবে এবং সাইজ 2MB এর বেশি করা যাবে না।
  2. যদিজমিটিআপনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকেন তাহলে একটি উত্তরাধিকার শংসাপত্র আপনাকে আপনার সঙ্গে রাখতে হবে  এবং  এরও একটি স্ক্যান কপি আপনাকে বানাতে হবে। অবশ্যই সাইজ 2MB এর কম হতে হবে। আর যদি আপনি এই জমিটি অন্য কোন ব্যক্তির থেকে কিনে থাকেন তাহলে উত্তরাধিকার শংসাপত্রের কোন প্রয়োজন নেই।
  1. জমিটির হাল খাজনার রশিদ (যদি থাকে)।
  1. জমিটিরপিটদলিল অর্থাৎ আপনি যে ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কিনেছেন ওই ব্যক্তি কারো না কারো কাছে জমিতে কিনেছে, এখানে পিট দলিল বলতে সেই ব্যক্তির দলিলটির কথা বলা হচ্ছে।
  1. একটি স্বঘোষণাপত্র,আপনি ইন্টারনেটে ডিক্লারেশন ডকুমেন্ট লিখে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন, ফরমটি ডাউনলোড করে এটি অবশ্যই ভালোভাবে ফিলাপ করবেন এবং এটির উপর একটি 10 টাকার কোর্ট ফি এটাচ করে দেবেন এবং তারও একটি স্ক্যান কপি বানিয়ে রাখবেন।

বাড়িতে বসে অনলাইন মিউটেশন (How to apply for online mutation In Banglarbhumi)

এবার আসা যাক বাড়িতে বসে অনলাইনে কিভাবে রেকর্ড এর জন্য আবেদন করা যায়।

 ধাপ ১.

সর্বপ্রথমে আপনি বাংলার ভূমি ওয়েবসাইট আপনার ক্রোম ব্রাউজারে ওপেন করুন। এখানে আপনাকে বলে রাখি বাংলারভূমি ওয়েবসাইটে আপনাকে একটি প্রোফাইল অবশ্যই বানিয়ে রাখতে হবে

দেখুন কিভাবেবাংলারভুমিতে নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করবেন 

ধাপ ২.

এরপরে সিটিজেন সার্ভিস বলে একটি মেনু রয়েছে সেখানে ক্লিক করুন।আপনার সামনে একটি ডায়লগ বক্স ওপেন হবে যেখানে একেবারে প্রথম অপশনটি অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন বাটনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৩.

আপনার সামনে আরেকটি নতুন ডায়ালগ বক্স দেখতে পাবেন সেখান থেকে মিউটেশন অ্যাপ্লিকেশন অপশনে ক্লিক করতে হবে। এবার আপনার সামনে এই ফরমটি ওপেন হবে যেটি step-by-step ফিলাপ করতে হবে। এটি হল সেই মিউটেশন ফরম যা সঠিক ভাবে ফিলাপ করে আপনি আপনার জমির রেকর্ড করতে পারবেন।

এখানে আপনি পাঁচটা মেনুবার দেখতে পাবেন Applicant Description,  Particular of transferer, List of Encloser, processing fees, SoP for disposal of mutation.

ধাপ ৪.

এই ফরমটিতে সর্বপ্রথমে এপ্লিকেন্ট ডেসক্রিপশন মেনুবারে আপনাকে আপনার তথ্য এবং তারপরে পার্টিকুলার অফ ট্রান্সফারার মেনুবারে আপনি যার কাছ থেকে জমিটি কিনছেন সেই ব্যক্তির তথ্য নির্ভুলভাবে আপনাকে পূরণ করতে হবে  এবং লিস্ট অফ এনক্লোজার মেনুবারে পূর্বে যে সমস্ত ডকুমেন্ট গুলো আপনাকে স্ক্যান করতে বলা হয়েছিল সেই সমস্ত  পিডিএফ ফাইল গুলো পরপর আপলোড করতে হবে।

ধাপ ৫. 

সবশেষে নিচে ক্যাপচা ফিল করবেন এবং টার্মস এন্ড কন্ডিশন চেকবক্সে টিক দিয়ে সাবমিট বাটনে ক্লিক করলে আপনার সামনে একটি ছোট ডায়লগ বক্স ওপেন হবে যেখানে আপনাকে আপনার তথ্যটি আপনার ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ হয়েছে কিনা তার বিষয়ে আপনি দেখতে পাবেন।

ডায়লগ বক্সটিতে একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করবেন যদি সবুজ রঙের টিক চিহ্ন দেখা যায় তাহলে বুঝবেন আপনার অ্যাপ্লিকেশনটি নির্ভুল হয়েছে আর যদি টিক চিহ্ন দেখতে না পান তাহলে পুনরায় ফরমটি ফিলাপ করুন এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার তথ্যটি কোথাও না কোথাও ভুল হয়েছিল।

এই ডায়ালগ বক্সটিতে আপনি একটি রেফারেন্স নাম্বার পাবেন যে নম্বরটি আপনাকে কপি করে রাখতে হব। এখানে আপনি এটাও দেখতে পাবেন যে আপনাকে আপনার জমির রেকর্ড করবার জন্য কত টাকা পেমেন্ট করতে হবে।

যদি পেমেন্ট ফিস না দেখায় তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনি কেস নাম্বার আপনার মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে পেয়ে যাবেন আর যদি প্রসেসিং ফিস অ্যামাউন্ট কিছু একটা দেখায় তাহলে আপনাকে পরবর্তী ধাপে সেই অ্যামাউন্ট পে করতে হবে।

আপনার অ্যাপ্লিকেশনটি যদি  সাকসেসফুল হয় তাহলে নিচে অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম টিডাউনলোড করুন এবং একটি ডিক্লারেশন ফর্ম দেওয়া থাকবে সেটিও ডাউনলোড করুন।অবশ্যই এটি প্রিন্ট করে রাখবেন।

আপনার যেদিন হেয়ারিং এর ডেট পড়বে সেইদিন এই অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম এবং ডিক্লারেশন ফর্ম এবং আপনার রেজিস্ট্রিকৃত দলিল সহ আপনাকে ভূমি সংস্কার দপ্তর এ  নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হতে হবে।

মিউটেশন এর আবেদন করার পড়ে কিভাবে পেমেন্ট করবেন ( How to pay online mutation fees in Banglarbhumi)

আমি মেনে চলছি আপনাকে কিছু না কিছু পেমেন্ট করতে হবে তো সে ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপ নিম্নরূপ অনুসরণ করুন।

ধাপ ১. সর্বপ্রথমে ফিস পেমেন্ট করার জন্য আপনাকে সিটিজেন সার্ভিস মেনুতে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ২. পরবর্তী ধাপ অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন এ ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ৩. এরপরে যে মেসেজ বক্সটি আপনি দেখতে পাবেন সেখানে ফিস পেমেন্ট বলে একটা অপশন রয়েছে সেখানে ক্লিক করুন।

আপনি রেকর্ড এর ফরম সাবমিট করার পরে  যে ডায়ালগ বক্সটি কে আপনি পেমেন্টের মেসেজটি দেখতে পেয়েছিলেন এবং আপনার অ্যাপ্লিকেশনটি ঠিক হয়েছে কিনা সেটি দেখতে পেয়েছিলেন সেখানেই আপনাকে একটি নাম্বার কপি করে রাখতে বলা হয়েছিল এই নম্বরটি ফিস পেমেন্ট এর জন্য প্রয়োজনীয়।

এবার আপনি যেহেতু করছেন তাই ওই নম্বরটা এখানে প্রদান করুন এবং ক্যাপচা ফিল করে সাবমিট করুন এবং আপনার  পেমেন্টটি করুন। সঙ্গে সঙ্গে আপনি একটি কেস নম্বর পাবেন।

এই কেস নম্বরটি হলো আপনার আবেদনের চাবিকাঠ। এটি খুব যত্নসহকারে আপনার সঙ্গে রাখবেন যদিও অ্যাপ্লিকেশন ফরমে নম্বরটি লেখা থাকে।

পরবর্তীকালে আপনার অ্যাপ্লিকেশন স্ট্যাটাস চেক করবার জন্য এই কেস নম্বর টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে আর একটি কথা মনে রাখবেন আপনি যদি জমিটি অন্য কোনো ব্যক্তির থেকে কিনে থাকেন তাহলে আপনার অ্যাপ্লিকেশন ফর্মটির একটি জেরক্স কপি বের করে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে অথবা স্পিড পোস্ট এর মাধ্যমে সেই ব্যক্তির কাছে পাঠাবেন এবং পোস্ট অফিস অথবা স্পিড পোস্ট এর তরফ থেকে আপনাকে একটি রিসিভ কপি দেওয়া হবে। এই রিসিভ কপি ও হেয়ারিং এর দিন ভূমি ও সংস্কার দপ্তর এর অফিসার দেখতে  চাইবেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!
Ads Blocker Image Powered by Code Help Pro

Help Us to Survive !! Disable Your Adblocker

We get motivation from you to create best content. Please support us by disabling these ads blocker.